৩টি কারণ কেন শুধুমাত্র অনুশীলনই নিখুঁত হওয়ার একমাত্র পথ নয়

আমার ফোনে দু’টি দাবা খেলার অ্যাপ আছে। একটি অ্যাপে রয়েছে প্রাত্যহিক জীবনের নানা পরিস্থিতি, যেখানে সঠিক চাল দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে হয়। অন্যটাতে রয়েছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নানান স্তরের জটিলতার দাবা খেলা সুযোগ।

আমি রোজ প্রতিটি ধাঁধা সমাধানকরি এবং দাবার বিভিন্ন গেম খেলি। আমার স্ত্রী আমাকে জিগেস করা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে যে আমি ফোন নিয়ে কী করছি, কারণ উত্তরটা প্রায় সবসময়ই হয়, “দাবা খেলছি”।

হ্যাঁ, আমি দাবা খেলি। অনেক।

দাবা খেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর হিসেব, যার নাম এলো রেটিং। আপনার দক্ষতার স্তর নির্ধারণ করতে এটি আপনি ব্যবহার করতে পারেন। আমার দু’টি অ্যাপই আমার অগ্রগতির হিসেব রাখে।

গত তিন মাস ধরে ঘণ্টার পর ঘন্টা প্রশিক্ষণের পরে, আমি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু করে এখনও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীই রয়ে গিয়েছি, শিখেই চলেছি। এখন আমি কেবল অর্ধেক সময়ে হারি। মনে হয় এই হারে শিখতে থাকলে ১৬০ বছর বয়সে গিয়ে মাস্টার ক্লাসে পৌঁছাবো। ( আধুনিক ওষুধ জমাচ্ছি প্রয়োজনীয় সময় পেতে।)

সত্যি বলতে কি আমি জানি যে আমি দাবা মাস্টার হতে পারব না। আমি দাবা ভালোবাসি, কিন্তু এও জানি যে একা একা অনুশীলন করে মাস্টার হওয়া সম্ভব না। কিন্তু, অধিকাংশ মানুষের মতই, আমি সেরা হতে চাই না; কেবল একটা সন্তোষজনক জায়গায় পৌঁছতে চাই মাত্র।

সুতরাং, আমার শৈশবের পিয়ানো শিক্ষিকা আমাকে যা করতে বলতেন আমি সেটাই করে যাই, অনুশীলন। কোনও কোনও সপ্তাহে যখন আমি স্বীকার করতাম যে আমি খুবই কম অনুশীলন করেছি আমাকে বকার সময়ে তিনি বলতেন, “অনুশীলন  মানুষকে নিখুঁত করে তোলে”।

কিন্তু, অনুশীলন যে সবসময় মানুষকে নিখুঁত করে না তার তিনটি কারণ এখানে বলব।

১ কতক্ষণ অনুশীলন করছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল কীভাবে করছেন

এই ভুল ধারণার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি দিয়ে শুরু করা যাক, অনুশীলনের পরিমাণ।

ভুল বুঝবেন না, আমি মনে করি, নতুন কিছু শিখতে হলে অনুশীলন অপরিহার্য। কিন্তু, তা যতটা না নির্ভর করে অনুশীলনের পরিমাণের ওপর তার থেকে অনেক বেশি নির্ভর করে আপনি কীভাবে অনুশীলন করছেন তার ওপর। ২০১৪ সালে, একদল গবেষক, সঙ্গীতশিল্পী এবং দক্ষ দাবাড়ুদের সম্পর্কে কয়েকটি পরীক্ষা পর্যালোচনা করে, একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে প্রকাশিত তথ্য দেখায় অনুশীলনের পুনরাবৃত্তি নয়, দক্ষতা অর্জন নির্ভর করে প্রশিক্ষণ পদ্ধতির ওপর।

শেখা এবং দক্ষতা বৃদ্ধিকে একই ছাঁদে ফেলে দেওয়া যায় না। আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব কৌশল রয়েছে একটি বিষয়কে আয়ত্ত করার ও চ্যালেঞ্জগুলি সমাধান করার।

সুতরাং, অনেক সফল সঙ্গীতশিল্পী একটি কঠোর সময়সূচিতে অনুশীলন করেন বলে আপনাকেও দক্ষ হবার জন্য একই ভাবেই অনুশীলন করতে হবে তা কখনওই নয়। Yo-Yo Ma যেমন বলেন,  কঠোর অনুশীলনের পরিবর্তে অনুশীলন করতে হবে বুদ্ধি খাটিয়ে।

ব্যবসা কীভাবে চালাতে হয় যখন শিখছেন, তখন দক্ষ উদ্যোক্তাদের পদ্ধতিগুলি অন্ধের মতো অনুসরণ করে সময় নষ্ট করবেন না। আপনি কোনটা করতে পারবেন সেটা শিখুন, এবং যেটা আপনার দ্বারা হবে না সেটা থেকে বেরিয়ে আসুন।|

২ কতবার ভুল করছেন নয়, অনুশীলন আপনাকে শেখাবে কতরকমের ভুল হতে পারে

অনুশীলন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে আপনি কম ভুল করবেন তেমন নয়। কারণটা বলি।

আসন্ন যেকোনও পরিবর্তনকে মাথায় রেখে মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষমতা বিষয়ক একটি গবেষণায়ে দেখা যাচ্ছে কেউ ভাল করছে মানে সে কম ভুল করছে এমন নয় বরং সে ভিন্ন ধরণের ভুল করছে।

আমার একটা চাকরিতে ঠিক এটাই হয়েছিল। শুরুতেই এত তথ্য দেওয়া হয়েছিল যা কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণের সময়ে শেখানোর বদলে গলগল করে তথ্য উগরে যাচ্ছিল। তথ্যের ভারে আমি এতটাই বয়ে গিয়েছিলাম যে নিজেকে আই লাভ লুসি-এর সেই বিখ্যাত এপিসোডের  লুসির মতো মনে হচ্ছিল, যেখানে সে কনভেয়র বেল্টে দাঁড়িয়ে চকোলেটের মান পরীক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর, আমি সবকিছু বোঝার চেষ্টা করা ছেড়ে নিজের ভুল থেকে শেখা শুরু করলাম।

এক বছর পর, চাকরির প্রতিটি দিক নিয়েই আমি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম যে সবসময়ই উন্নতির সুযোগ আছে।

আমি কি তখনও ভুল করতাম? অবশ্যই।

কখনও কখনও, শুরুর সময়ের মতোই একই হারে করতাম। যদিও ভুল করার ধরণ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা যা শুধুমাত্র অন্যান্য অভিজ্ঞ কর্মীদের চোখেই ধরা পড়ত।

তাহলে এর মানে কি?

এটার মানে হলো সবসময়ই উন্নতির জায়গা রয়েছে, সুযোগ রয়েছে আরও ভাল করার।|

অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের ভুলের সংখ্যা কমে না, এর ফলে আমরা মুর্খের মত হঠকারী ভুলের বদলে দক্ষতা নির্ভর ভুল করি।

৩ কখনও কখনও এটি বংশগত

পাগলের মত অনুশীলন ও নিজস্ব প্রয়োজন মতো প্রশিক্ষণের পরেও পেশাদারী স্তরের দক্ষতা অর্জনের জন্য অনেক সময়েই একটি অতিরিক্ত ধাক্কার প্রয়োজন হয় যা হল একটি গোপন উপাদান। আর এই কারণেই ‘অনুশীলন সাফল্য আনে” এটা ঠিক নয়।

কখনও কখনও আপনি এটা নিয়েই জন্মান কখনও বা তা নয়।

আমরা লোককে বলতে শুনি, “আমি এটা করতেই জন্মেছি”। এই কথাটির মধ্যে কিছু সত্যি আছে।  শুনতে ভাল লাগুক আর নাই লাগুক আপনি কিছু দক্ষতা এবং কিছু ঘাটতি নিয়ে জন্মেছেন, যা হয় আপনাকে একজন সুপারস্টার বানাবে অথবা শুধুমাত্র একজন আকুলভাবে চেয়ে থাকা পদপ্রার্থী।

যত খুশি অনুশীলন করুন,  কিন্তু হতেই পারে আপনি হয়তো খ্যাতি পেলেন না। আপনি চেষ্টা করতে পারেন এবং সম্ভবত আপনি সত্যিই ভাল করবেন, কিন্তু মহত্ কিছু করতে হলে অনেক সময়ই সংকল্প ছাড়াও আরও বেশি কিছু প্রয়োজন হয়।

তাই, এমন কিছু করার পিছনে সময় নষ্ট করবেন না যেটা আপনার জন্য নয় |

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *